• রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:৫১ পূর্বাহ্ন

দেশের ৯০% মানুষ বীমা আওতার বাইরে

টাঙ্গন টাইমস ডেস্ক / ১২৩ Time View
Update : শুক্রবার, ১ মার্চ, ২০২৪

প্রতি মুহূর্তে অনিশ্চয়তায় ভরা মানুষের জীবন। আর আমাদের দেশে এখনো এক বা দুজনের আয়ে চলে পুরো পরিবার। পরিবারের সেই উপার্জনক্ষম মানুষটি যদি কোনো দুর্ঘটনায় মারা যান, তাহলে পুরো পরিবারটির পথে বসার উপক্রম হয়। সেই ক্ষতি কোনো কিছুর বিনিময়েই পোষানো না গেলেও কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে বীমা। অর্থাৎ সেই মানুষটি যদি বীমা সুবিধার আওতায় থাকেন, তাহলে সেই পরিবার স্বল্পপরিসরে আর্থিক ক্ষতিপূরণ পেয়ে থাকে। বীমা শুধু জীবনের নিশ্চয়তা দেয় তা নয়, মানুষের সম্পদেরও

নিরাপত্তা দেয়। শুধু তাই নয়, একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে সমাজের বয়োবৃদ্ধদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিরসন এবং পেনশন বীমার মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতও একটি কার্যকর ব্যবস্থা। তাই উন্নত বিশ্বে মানুষের জীবন ও সম্পত্তিতে সৃষ্ট এসব ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মতো জটিল কাজ আর্থিক খাতে সমাধান করা হয় একমাত্র বীমার মাধ্যমেই। সেখানে বীমা ছাড়া এক পাও এগোনো সম্ভব নয়, আর আমাদের দেশে এখনো ৯০ শতাংশ মানুষ বীমার আওতার বাইরে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে বীমার আওতায় নিয়ে আসার চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখেই দেশে পঞ্চমবারের মতো পালিত হচ্ছে জাতীয় বীমা দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘করবো বীমা, গড়বো দেশ, স্মার্ট হবে বাংলাদেশ’। দিবসটি পালন উপলক্ষে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে দেশব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো দেশে বীমা খাতের প্রসার ঘটানো।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের বীমা খাতটি অর্থনীতির অন্য সব সূচকের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারেনি। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে জিডিপির আকার যেভাবে বড় হচ্ছে, সেভাবে বড় হচ্ছে না বীমা খাত। এর মূল কারণ আস্থাহীনতা। পুরো খাতটিরই আছে ভাবমূর্তির সংকট; যদিও ধীরে ধীরে তা কাটছে।

আরও পড়ুন : ঠাকুরগাঁওয়ে জাতীয় বীমা দিবস উদযাপন

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার (আইডিআরএ) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে সব মিলিয়ে ৮২টি বীমা প্রতিষ্ঠান সেবা দিচ্ছে। এর মধ্যে লাইফ ৩৬টি আর নন লাইফ ৪৬টি। বর্তমানে ১৭ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে বীমার আওতায় আছে মাত্র ১ কোটি ৭১ লাখ মানুষ, যা শতাংশের হিসাবে ১০ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ এখনো বীমা সেবার বাইরে রয়ে গেছে।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২২ সালে মোট বীমার পরিমাণ ছিল এক কোটি ১৪ লাখ ২ হাজার ৮৬৯টি, যা ২০২৩ সালে কিছুটা কমে হয়েছে ৯৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৯৯টি। এ সময়ে লাইফে কমলেও নন-লাইফে বীমার পরিমাণ বেড়েছে। একই সময়ে লাইফ এবং

নন-লাইফ উভয় ক্ষেত্রেই প্রিমিয়ামের পরিমাণ বেড়েছে। সব মিলিয়ে ২০২২ সালে যেখানে প্রিমিয়ামের পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ১৭ কোটি, যা ২০২৩ সালে বেড়ে হয়েছে ১৭ হাজার ৪৮৪ কোটি। সেই হিসাবে প্রিমিয়ামে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। যদিও ২০২২ সালে এই প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। ২০২৩ সালে মোট বীমা দাবির পরিমাণ কমে হয়েছে ১৫ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা, যা আগের বছর ছিল ১৬ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা। বীমা দাবির তুলনায় দাবি পরিশোধের হার অনেক কম। ২০২৩ সালে বীমা দাবি পরিশোধের পরিমাণ কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা, যা আগের বছর ছিল ১০ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে বীমা দাবির পরিমাণ কিছুটা কমেছে।

দাবি পরিশোধের পরিমাণ কমলেও প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে ৪ শতাংশ। ২০২২ সালে লাইফে বীমা দাবি পরিশোধের হার ছিল ৬৭ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে কিছুটা বেড়ে হয়েছে ৭২ শতাংশ। আর নন-লাইফে বীমা দাবি পরিশোধের হার ৬ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৪১ শতাংশ। সব মিলিয়ে ২০২৩ সালে বীমা দাবি পরিশোধের হার দাঁড়িয়েছে ৬৫ দশমিক ১৯ শতাংশ, যা আগের বছর ছিল ৬১ দশমিক ১৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের শেষে বেসরকারি জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৩ হাজার ৮ কোটি টাকা, আর সম্পদের পরিমাণ ছিল ৪২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা।

এ ছাড়া ২০২২ সালের শেষে কোম্পানিগুলোর জীবন তহবিল ৩১ হাজার ৫৯৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা, আর প্রিমিয়াম আয় ১০ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা ছিল। একই সময়ে বেসরকারি নন-লাইফ তথা সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর প্রিমিয়াম আয় ছিল ৪ হাজার ১৬২ কোটি ৬০ লাখ টাকা, সম্পদের পরিমাণ ১১ হাজার ৭৬ কোটি ২০ লাখ টাকা ও বিনিয়োগ ৫ হাজার ৯৮৬ কোটি ১০ লাখ টাকা।

জানা যায়, দেশের বীমা খাত শুরু থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বীমা অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অথচ বিশ্বের প্রায় সব দেশেরই বীমা খাত থাকে অর্থ মন্ত্রনালয়ের আওতায়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিরোধিতা সত্ত্বেও ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো তত্ত্বাবধায়ক সরকার বীমা খাতকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতায় নিয়ে আসে। এরপর আওয়ামী লীগ সরকার বীমার গুরুত্ব অনুধাবন করে নতুন বীমা আইন ২০১০ প্রণয়ন করে।

পাশাপাশি প্রণয়ন করে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইন ২০১০। এরপর বীমা খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ২০১১ সালে অধিদপ্তর বিলুপ্ত করে প্রতিষ্ঠা করা হয় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। সেই হিসাবে আইডিআর-এর বয়সও ১৩ বছর। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়েও বীমা খাত যেন সেই এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। অথচ উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় নাম লেখাতে বাংলাদেশের মাত্র বাকি আছে দুই বছর। এখনো জিডিপির তুলনায় বীমা খাতের অবদান মাত্র আধা শতাংশ। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক রি ইনস্টিটিউটের ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জিডিপিতে ২০২০ সালে জীবন বীমার অবদান ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ২৯ শতাংশ এবং

নন-লাইফ বীমার অবদান শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ। দুটি মিলে শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ। অথচ প্রতিবেশী ভারতের জিডিপিতে বীমার অবদান ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। আর উন্নত দেশগুলোতে এ হার ৯ থেকে ১০ শতাংশের মতো।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দক্ষ ও নিষ্ঠাবান জনবলের অভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আইডিআরএ বীমা কোম্পানিগুলোকে সঠিকভাবে তদারক করতে পারছে না। দক্ষ জনবল তো দূরের কথা, এত বছরেও তেমন জনবল নিয়োগ দিতে পারেনি সংস্থাটি। বাংলাদেশ ব্যাংকের জনবল যেখানে ছয় হাজার, সেখানে আইডিআরএর জনবল মাত্র ১০০ জনের মতো। যে কারণে এই সংস্থা না পারছে বীমা খাতের উন্নয়ন ঘটাতে, না পারছে তার আওতাধীন কোম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে। অথচ দেশে ব্যাংকের চেয়েও বীমা কোম্পানির সংখ্যা বেশি। অন্যদিকে বীমা খাতে রয়েছে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি। সময়মতো গ্রাহকদের বীমা দাবি পরিশোধ না করা, কর ও ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া, কমিশন প্রথার অপব্যবহার, অগ্নি বীমার সুযোগ নিয়ে অন্যায্য অর্থ আদায়, কোম্পানি থেকে টাকা বের করে নিতে পরিচালকদের নানারকম

ফন্দি-ফিকির, জমি কেনার নামে অর্থ আত্মসাৎ ইত্যাদি অহরহই ঘটছে। এ ছাড়া বাস্তবতা বিবেচনা না করেই দফায় দফায় বীমা কোম্পানির লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এতে কোম্পানিগুলো একরকম অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকছে। এমন বাস্তবতায় বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ রেখে বলছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অবশ্যই মানুষকে বীমামুখী করতে উদ্যোগী হতে হবে। এর পাশাপাশি এ খাতে নানাভাবে যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে হবে। স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ডিজিটাইজেশন জোরদার করতে হবে।

জানতে চাইলে আইডিআরএ চেয়ারম্যান ও সরকারের সাবেক সচিব মোহাম্মদ জয়নুল বারী বলেন, এটা ঠিক যে, দেশের সার্বিক অর্থনীতি যে গতিতে এগোচ্ছে, বীমা খাত সেভাবে এগোতে পারছে না। প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ঠিকই, তবে আমাদের জিডিপির প্রবৃদ্ধির তুলনায় অনেক কম। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আমাদের দেশের মানুষ বীমাবান্ধব নয়। আমরা মনে করি, বিপদে পড়লে কোনোভাবে ম্যানেজ করে নেব; কিন্তু আমাদের জীবনে যে কোনো সময় বিপদ আসতে পারে এবং বিপদে পড়লে আমাদের জীবনে নানা ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, সেজন্য আগে থেকে পরিকল্পনা করি না। এটা যেমন ব্যক্তিগত জীবনে, তেমনি

ব্যবসা-বাণিজ্য অর্থনীতির সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সরকারি বাধ্যবাধকতা অর্থাৎ আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকলে কেউ বীমা করে না। এ ছাড়া, অনেক প্রতিষ্ঠান বীমা দাবি পরিশোধ না করায় মানুষের মধ্যে এক ধরনের আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে। দেশের জনসংখ্যার তুলনায় বীমা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও অনেক বেশি। এর ফলে তাদের মধ্যে এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেখা যায়। কারণ আমাদের সাধারণ বীমার বাজার খুবই ছোট। এক্ষেত্রে কমিশন দেওয়া নিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেখা যায়। দায়িত্ব নেওয়ার পর এগুলো বন্ধ করার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। বীমা দাবি পরিশোধের উপর জোর দিয়েছি। বীমা খাতের উন্নয়নে যা যা করা দরকার, তার সবটাই করছি। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দরকার ডিজিটাইজেশন।

এরই মধ্যে বীমা খাতে অটোমেশনের কাজ শুরু হয়েছে। এই অটোমেশন বাস্তবায়ন হলে বীমা খাতের অনিয়ম শূন্যের কোটায় নেমে আসবে। এর পাশাপাশি বীমার বিধিবিধান ও প্রবিধানগুলো আরও বীমাসহায়ক ও গ্রাহকবান্ধব করা হচ্ছে। ফলে চাইলেই কেউ আর বীমা খাতে অনিয়ম করতে পারবে না। আর ব্যাংকাস্যুরেন্স চালু হলে আরও অনেক মানুষ বীমা সুবিধার আওতায় আসবে। সেইসঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও বঙ্গবন্ধু শিক্ষা বীমা চালু করা হচ্ছে। সম্প্রতি প্রায় ২ লাখ শিক্ষার্থী বীমা সেবার আওতায় এসেছে। এই সংখ্যা অব্যাহতভাবে বাড়বে। সব মিলিয়ে অদূরভবিষ্যতে বীমা খাতে আমূল পরিবর্তন আসবে। সেইসঙ্গে বীমা খাতের প্রসারও ঘটবে।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
https://slotbet.online/