• মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪, ০৪:২৫ পূর্বাহ্ন

স্বতন্ত্র ও নৌকা প্রার্থীদের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসছে

Reporter Name / ৯৮ Time View
Update : শুক্রবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২৩

বিএনপি বিহীন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘ডামি’ প্রার্থী কৌশল নিয়ে এগুচ্ছে ক্ষমতাশীন দল আওয়ামী লীগ। দলীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সূত্রগুলো বলছেন, নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ করতেই এমন কৌশল দলটির। দলের নমনীয়তার সুযোগ দিয়ে অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থী নৌকা প্রার্থীদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে। এর ফলে নির্বাচন মাঠে শুরু হয়ে গিয়েছে দ্বন্দ্ব, তা প্রকাশ্যেও আসছে। তবে আওয়ামী লীগ সূত্রগুলো জানিয়েছে, কৌশলগত কারণেই এ বিষয়টি করা হয়েছে।

তবে ‘ফ্রি স্টাইলে’ স্বতন্ত্র প্রার্থীদের যেমন রাখা হবে না এটা যেমন সত্য, তেমনি কোন কোন আসনে বিষয়টি রাখা হবে এটাও এখন ঠিক হয় নি। আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, মনোনয়ন জমা দেওয়ার আগে-পরে এমন ঘটনা ভাবাচ্ছে দলকে। পরিস্থিতি এখনই নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে তা চরম আকার ধারণ করতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তাদের অনেকেই।

গত রোববার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৮টি আসনে ‘নৌকার মাঝি’ দেয় আওয়ামী লীগ। এর আগে একই দিনে দলীয় ৩ হাজার ৩শ ৬২জন মনোনয়ন প্রত্যাশীর সঙ্গে বৈঠক করে বিভিন্ন আসনে ‘ডামি’ প্রার্থী দেওয়ার নির্দেশনা দেন দলীয় প্রধান শেথ হাসিনা। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সঙ্গে মতবিনিময়ে শেখ হাসিনা অনেক আসনে ‘ডামি’ প্রার্থীদের দাঁড়ানোর বিষয়ে নির্দেশনা দেন। যাকে ‘সবুজ সংকেত’ মেনে নিয়ে নির্বাচনী মাঠ গরম করতে শুরু করে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থীরা। ওই সভায় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, যেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কেউ নির্বাচিত হতে না পারে। সে ক্ষেত্রে একাধিক ডামি প্রার্থী রাখতে মত দেন দলীয় প্রধান।

জানা গেছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে ৩০০টি আসনে মোট ২ হাজার ৭১৩টি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে ৩২টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী রয়েছেন ১ হাজার ৯৬৬ জন। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন ৭৪৭ জন। এ মধ্যে সিংহভাগই আওয়ামী লীগের।

তবে একটি দলীয় সূত্রগুলো বলছে, যারা দলের ‘ডামি’ প্রার্থী হবেন তাদের দলীয় প্রার্থীর সঙ্গে দলের প্রার্থীরা সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াবেন না। এসব প্রার্থী কখনোই মূল প্রার্থীর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন না। কিন্তু এই বিষয়টির সুযোগ হিসেবে নিয়ে সারা দেশেই নৌকার প্রার্থীদের বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়ে গেছে অনেক ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থী। এর ফলে নির্বাচনী মাঠে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কাও দেখছেন আওয়ামী লীগের অনেক নেতা। গত কয়েকদিনে বেশ কয়েকটি জায়গায় দলের নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসেছে।

কয়েকটি জায়গায় এসব দ্বন্দ্ব সংঘর্ষের পর্যায়ে পৌছে গেছে। ফলে বিবাদে জড়াচ্ছেন অনুসারীরা। মনোনয়ন জমা দেওয়ার পর নির্বাচনী মাঠে এ দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন দলের অনেক নেতা। বিষয়টি নিয়ে দলের কেন্দ্র থেকেও ভাবা হচ্ছে। গতকাল শুক্রবারও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ঢালাওভাবে সবাই স্বতন্ত্র নির্বাচন করবে বিষয়টা এমন নয়। ১৬ তারিখ পর্যন্ত দলীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।

দলীয় সূত্রগুলো বলছেন, এর আগে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে দাঁড়ালে দলে বিদ্রোহী বিবেচনা করে দল থেকে বহিস্কারের মত সিদ্ধান্তও এসেছিল। তবে ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচন করে অনেক নেতা সংসদ সদস্য হন। এ বিষয়টি নিয়ে দেশে বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার মধ্যে পরতে হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারকে। অপর দিকে বিএনপির মত বড় দল নির্বাচনে আসছে না এসব বিবেচনায় নিয়েই আওয়ামী লীগ এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার কৌশলে গিয়েছে। এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও আসে নি। আগামী ১৭ ডিসেম্বরের পরই এমব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে আওয়ামী লীগ।

সারা দেশের স্থানীয় পর্যায় থেকে খবর আসছে, প্রায় সব আসনেই স্বতন্ত্র মনোনয়ন জমা দেওয়ার পর কোথাও বর্তমান সংসদ সদস্যের সঙ্গে দলের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের একটি দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গিয়েছে। যা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হয়েছে। সবাই আওয়ামী লীগের হওয়ায়, কেউ কাউকে কথাবার্তায়, আচরণে কোনও ছাড় দিচ্ছেন না। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত চরম আকার ধারণ করতে পারে বলে দলের কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন।

গত বৃহস্পতিবার মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিনে শরীয়তপুরের নড়িয়ায় নৌকার প্রার্থী এনামুল হক শামীমের সমর্থকদের সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী যুবলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও প্রয়াত ডেপুটি স্পিকার কর্ণেল স্পিকার শওকত আলীর ছেলে ডা. খালেদ শওকত আলীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। জানা গেছে, দু’ পক্ষ থেকেই বিপুল পরিমাণ ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। এ সময় উভয় পক্ষের নেতারাই আহত হয়েছেন। তাদের নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও মাজেদা শওকত হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ওই দিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে নড়িয়া বাজার এলাকায় এ সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এর পর দফায় দফায় সংঘর্ষ এবং ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলতে থাকে মধ্যরাত পর্যন্ত। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।

এ দিকে, গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রয়াত ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়ার মেয়ে ফারজানা রাব্বি বুবলির গাড়ি বহরে হামলার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ওই স্বতন্ত্র প্রার্থীর অন্তত ২০ সমর্থক আহত হয় এবং তাদের কমপক্ষে ৫টি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে নৌকা প্রার্থীর সমর্থকরা। ৩০ নভেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সাঘাটা উপজেলার জুমারবাড়ি এলাকায় হামলা করা হয়।

বরিশাল-৫ (সদর) আসনের প্রার্থী নিয়ে আওয়ামী লীগে উত্তাপ ছড়িয়েছে এরই মধ্যে। এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি জাহিদ ফারুককে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ায় বঞ্চিতরাও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার ঘোষণা দিয়েছেন। এরই মধ্যে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ ও মো. সালাহউদ্দিন রিপন নামে দুজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এর পর থেকেই প্রার্থী ও অনুসারীদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে কিছুটা উত্তাপ ছড়াচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের হাব খ্যাত এই আসনটিতে।

চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনে সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ মোতালেব স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় দল থেকে তাকে বহিষ্কারের দাবিতে ঝাড়ু মিছিল করেছে যুবলীগ ও ছাত্রলীগ। পাশাপাশি তার ছবিও পোড়ানো হয়েছে। ঝাড়ু মিছিল ও ছবিতে আগুন দেওয়ার ঘটনার পেছনে সংসদ সদস্য আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামউদ্দিন নদভীর অনুসারীরা রয়েছেন বলে দাবি করেছেন এম এ মোতালেব। তিনি বলেন, নদভীর লোকজন নির্বাচনের শুরুতেই অন্যায় করছেন। তারা ঝাড়ু মিছিল ও ছবিতে আগুন দেওয়ার মতো জঘন্য কাজ করেছেন। তাছাড়া, উপজেলার দেওদীঘি এলাকায় আমার সঙ্গে দেখা করতে আসার সময় কিছু লোককেও আটকে রেখেছিলেন তারা।

গত বুধবার কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী সালাহ উদ্দিন আহমদের সমর্থকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে ১২ জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনা সাহারবিল ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নবী হোছাইনের নেতৃত্বে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন সালাহ উদ্দিন আহমদ। নবী হোছাইন বর্তমান সংসদ সদস্য ও স্বতন্ত্র প্রার্থী জাফর আলমের অনুসারী। তবে নবী হোছাইন এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

গত বৃহস্পতিবার পটুয়াখালীর কলাপাড়া পৌর শহরে সাবেক পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান সমর্থিত নেতাকর্মীরা হামলার শিকার হন। তার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) সংসদীয় আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করার কথা ছিল। বেলা ১০টার দিকে কলাপাড়া পৌর শহরের গোডাউন ঘাট এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন কলাপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এসএম মনিরুল ইসলাম (৫০) এবং উপজেলা যুবলীগের সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক অসীম তালুকদার (৫২)। তাদের কুপিয়ে জখম করেছে কতিপয় সন্ত্রাসীরা। আহত দুজন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বঞ্চিত নেতা সাবেক পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও কলাপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. মাহবুবুর রহমানের সমর্থক। এ সহিংস ঘটনায় বর্তমান সংসদ সদস্য মো. মহিবুর রহমানকে দায়ী করেছেন মাহবুবুর রহমান।

স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, আওয়ামী লীগ একটি সুশৃংখল রাজনৈতিক দল। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা এটি পরিচালনা করেন। নেতা-কর্মীরা বঙ্গবন্ধু কন্যার দিকে সব বিষয়ে তাকিয়ে থাকে। তিনি যা নির্দেশ দেন সবাই তাই পালন করে। স্বতন্ত্র প্রার্থী নিয়ে ইতো মধ্যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ১৭ তারিখ পর্যন্ত সময় আছে। সুনির্দিষ্ট জায়গা ছাড়া যে কোন জায়গায় ইচ্ছে মত কেউ প্রার্থী হতে পারবে না। সময় আসলে এটি আরো সুন্দরভাবে পরিষ্কার হবে।

আরএম/টাঙ্গন টাইমস


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
https://slotbet.online/